শিক্ষাজগতে অনন্য নজির গড়েছেন সঙ্গীতাচার্য আবু দাউদ

0
115
শিক্ষাজগতে অনন্য নজির গড়েছেন সঙ্গীতাচার্য আবু দাউদ
শিক্ষাজগতে অনন্য নজির গড়েছেন সঙ্গীতাচার্য আবু দাউদ
ShyamSundarCoJwellers

শিক্ষাজগতে অনন্য নজির গড়েছেন সঙ্গীতাচার্য আবু দাউদ

অনল আবেদীন

প্রাচীন ভারতে শিক্ষাদান চলত গুরুগৃহে। তার মোক্ষম দৃষ্টান্ত রামায়ণ। সেখানে আমরা দেখি, রামচন্দ্রের যমজ সন্তান লব ও কুশের যাবতীয় শিক্ষাদীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে মহর্ষি বাল্মিকীর গৃহে ও বাল্মিকীর হাতে। একই প্রথার প্রমাণ আছে মহাভারতে। গুরু দ্রোণাচার্যের গৃহে ও তাঁর হাতেই কৌরব ও পাণ্ডবরা শিক্ষাদীক্ষা পেয়েছিলেন বলে মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে। আজ আর সেই রাম নেই, নেই সেই রাজত্বও। এখন আর শিক্ষাদান করা হয় না। এখন অনেক ক্ষেত্রেই মুদিখানার সওদার মতো শিক্ষা বিক্রি করা হয়। গুরুশিষ্যের চালচিত্র আজ বদলে গিয়েছে ক্রেতাবিক্রেতার দেনাপাওনার সম্পর্কে। এই আবহেই বিরল ব্যতিক্রমী এক অনন্য শিক্ষকের হদিশ রয়েছে এপার বাংলার এক মফস্বল শহরে।

পুরাকালে বাল্মিকী ও দ্রোণাচার্য তাঁদের নিজগৃহে রেখে শিষ্যদের দিয়েছিলেন অস্ত্রসস্ত্র শিক্ষা। আধুনিক কালের ওস্তাদ আবু দাউদ খাঁ (১৯২৬-১৯৯৯) তাঁর শিষ্য-শিষ্যাদের নিজগৃহে রেখে শিখিয়েছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। খেয়াল-ঠুংরি। তাঁর পৈত্রিক নাম আবু দাউদ। তবুও তিনি তাঁর সুরের বিস্তারের সঙ্গেই রসিকজন থেকে শুরু করে আমজনতা পর্যন্ত সবার কাছেই হয়ে উঠেছিলেন ‘ওস্তাদ আবু দাউদ খাঁ’।

মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরের প্রাচীনতম এলাকাটির নাম খাগড়া-কাঁসারিপাড়া। খাগড়া চৌরাস্তার মোড় থেকে উত্তর দিকে ১০০ মিটার মতো এগিয়ে গেলে বাঁ হাতের পশ্চিম দিকে পড়বে খাগড়া শ্মশানঘাটের গলি। তার মুখোমুখি, ডান হাতে, পূর্ব দিকে কাঁসারিপাড়ার গলি। গলিতে ১৫-২০ ফুট যাওয়ার পরই একটি দোতলাবাড়িকে বেষ্টন করে তিন দিকে চলে গিয়েছে তিনটি গলি। দোতলা বাড়িটির হোল্ডিং নম্বর ২৯, রাস্তার নাম রামসুন্দর মুন্সি লেন। এটি আবু দাউদের তিন পুরুষের পুরনো বাড়ি। এই বাড়িটি এপার বাংলার শাস্ত্রীয়সঙ্গীত চর্চার অন্যতম তীর্থক্ষেত্রও বটে। ওই দোতলা বাড়ির একতলার ঘরগুলোর মধ্যে একটি তেকোনা ঘরও আছে। পথ লাগোয়া ত্রিভুজাকৃতির সেই বিখ্যাত ঘর থেকে একদা গভীর রাতে ঘুমনোর সময় ও দুপুরের আহারের সময়টুকু বাদ দিয়ে বাকি সব সময় সুর ভেসে আসত। জগতখ্যাত খাগড়াই কাঁসার বাসন তৈরির টুংটাং আওয়াজের সঙ্গে মহাসঙ্গীতের রাগরাগিণীর সুর মিশে গিয়ে মহাকালের দিকে ধাবিত হতো অনির্বচনীয় এক ইন্দ্রিয়াতীত মহানুভুতি।

সেই ঘরে বসে আবু দাউদের কাছ থেকে জীবনের প্রথম পর্বে রাগসঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন ও সুরের ভিত গড়েছিলেন সম্প্রতি প্রয়াত ভারতখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী, পণ্ডিত অরুণ ভাদুড়ি এবং তাঁর মতো অনেক সঙ্গীত বিশারদ। ওই সঙ্গীতঘর ধন্য হয়েছে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, সাগিরুদ্দিন খাঁ, রসিদ খাঁ, অজয় চক্রর্বতী, তবলিয়া শ্যামল বোস, সানাই-এর যাদুকর ওস্তাদ আলি আহমেদ হোসেন, সেতারের সুবিখ্যাত পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো ধ্রুপদী সঙ্গীতের আরও অনেক দিকপালদের পদধূলিতে, তাঁদের সুরের মুর্ছনায়। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, নদিয়া, দুর্গাপুর ছাড়িয়ে দাউদের শিষ্যশিষ্যা ছড়িয়ে আছে ঢাকা ও রাজশাহিতে।

তখনও বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। তিনকোনা ঘরের জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকত একটি বালক। ভেসে আসা সুরে সুরে তন্ময় হয়ে যেত, পথপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কিশোর। সেই কিশোর পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে আসা, চালচুলোহীন এক উদ্বাস্তু। সে তখন কাশিমবাজারে এক আত্মীয়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। খাগড়া এলাকার একটি দোকানের কর্মী হিসাবে ওই কিশোরের জীবিকার শুরু। ঘোষ পদবির ওই বালকের সুরপ্রীতির জন্য আবু দাউদ তাকে নিয়ে এলেন তাঁর ২৯ নম্বর রামসুন্দর মুন্সি লেনের সঙ্গীতভবনের তেকোনা ঘরের ভিতরে। নিজের ও ছাত্রছাত্রীদেট অবাধ সঙ্গীত সাধনার জন্য দাউদ তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামের বাড়িতেই পাঠিয়ে দিলেন।

তাঁর পরিবার কয়েক বছর ছিল বহরমপুর থানার (এখন দৌলতাবাদ থানা) ছয়ঘরি গ্রামে। পিতৃ-মাতৃহীন শরণার্থী বালকটি কিন্তু রইল দাউদের খাগড়ার বাড়িতেই। ছিন্নমূল ওই বালকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সঙ্গে অবশ্যই উচ্চাঙ্গসঙ্গীত। সেই বালক একদিন ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। সঙ্গীত জগতেও নাম করেন। আবু দাউদের অভিভাবকত্বে তাঁর বিয়ে হয় আর এক সঙ্গীত শিল্পীর সঙ্গে। গত শতাব্দীর ৮০-র দশকে বহরমপুর শহরে নবদম্পতি নিজস্ব সংসার পাতেন। উদ্বাস্তু জীবনের সেই বালক আজ আকাশবাণী ও দুরদর্শনের প্রতিষ্ঠিত উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পী। গত শতাব্দীর ৮০র দশকের শুরুতে অনিল সাহা নামের আর এক কিশোর বাংলাদেশ থেকে চলে এসে খাগড়ার একটি বস্ত্র প্রতিষ্ঠানে কর্মচারীর কাজ নেয়।

তাঁরও আশ্রয় হয় আবু দাউদের ২৯ নম্বর রামসুন্দর মুন্সী লেনের তিনকোনা ঘরেই। সেই ঘরে আবু দাউদের কাছে প্রায় এক দশক সঙ্গীত সাধনার পর ১৯৮৮ সালে অনিল চলে যান ঢাকায়। ঢাকায় বাস করেন আবু দাউদের ভাগ্নে জাহাঙ্গির এহিয়া। ব্যাঙ্কের উচ্চপদস্থ অফিসার জাহাঙ্গির এহিয়ার বাড়িতে অনিলের থাকার ব্যবস্থা করে দেন আবু দাউদ। পরিচয় করিয়ে দেন ঢাকার সঙ্গীত জগতের দিকপালদের সঙ্গে। অনিল এখন বাংলাদেশের খেয়াল গানের প্রথম সারির নিয়ন্ত্রক শিল্পীদের একজন। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে তিনি দিল্লিতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পসরা উজাড় করে দিয়েছেন। দাউদের অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এক জন সঙ্গীতশিষ্যের নাম গৌতম ভট্টাচার্য ওরফে বুলা। বুলাও আবু দাউদের কাছে সন্তানস্নেহে সঙ্গীতের তালিম নিয়েছেন অনিলের সমকালেই। খাগড়া বড়মুরির ধারের পৈত্রিক বাড়ি, নাকি কাঁসারিপাড়ার গুরুগৃহ— কোনটা তাঁর নিজস্ব আশ্রয়? আবু দাউদের জীবিতকালে তা ভুলে গিয়েছিলেন বুলা নিজে ও স্থানীয় লো কজনও। বিপথে যাওয়ার জন্য মারকাটারি জগতের হাতছানি বুলা এড়াতে পেরেছেন ওস্তাদ দাউদ খানের অভিভাবকত্বে সুরসমুদ্রে অবগাহন করার ফলে।

বাঙ্গালি মুসলিমদের মধ্যে আবু দাউদই দুই বাংলার মধ্যে প্রথম খেয়াল গানের গুরুদেব। ওস্তাদ। তাঁর তিন পুরুষে কেউ অবশ্য কখনও সঙ্গীতের ধারধারেননি। বাবা কাদেরবক্স মণ্ডল ছিলেন পেশায় ঠিকাদার। এমন বাবার এই ছেলের শাস্ত্রীয়সঙ্গীতই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা। শাস্ত্রীয়সঙ্গীত জগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া নিয়ে এপার বাংলার বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি হিন্দুর মধ্যে বরাবর একটি অপ্রকাশ্য টানাপোড়েন ছিল ও আজও আছে। সরকারি স্তরেও সেই ভাগাভাগি অন্তঃসলিলার মতো বহমান। এই সুপ্ত সাম্প্রদায়িক দ্বৈরথের কারণে আবু দাউদ এপার বাংলায় যোগ্য মর্যাদা পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে বহু বার। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের সরকার সেই দেশের সঙ্গীত আকাদেমির সর্বোচ্চ আসনটিতে তাঁকে বসাতে চেয়েছিল। জন্মভূমি ত্যাগ করার বেদনা সইতে পারবেন না বলে বাংলাদেশের দিকপাল সঙ্গীতশিল্পীদের দীক্ষাগুরু আবু দাউদ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।

প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা ভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের সন্তানদের বিয়ে করলেও বাবা হিসাবে দাউদ কখনও বাধা হয়ে দাড়াননি। বরং, এ কারণে, কয়েক মাস সপরিবারে বহরমপুরের সঙ্গীতবাড়ি ছেড়ে সঙ্গীতগুরুকে পলাতক অবস্থায় কয়েক জায়গায় আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছিল। সম্প্রীতি রক্ষার টানে ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে মর্যাদা দেওয়ার অভিপ্রায়ের কারণে সঙ্গীতগুরুকে এভাবে কঠোর মূল্য চোকাতে হয়েছে জীবনের প্রায় শেষপর্বে পৌঁছে। তবু তিনি বিভেদবাদীর সঙ্গে আপোষ করেননি। সুরের বিশুদ্ধতার প্রতি দায়বদ্ধ আবু দাউদের ঘরাণায় খেয়াল ও নজরুলগীতি ছাড়া অন্য সঙ্গীতের অনুপ্রবেশ ছিল কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। এই সীমা লঙ্ঘণ করা ছাত্রছাত্রীদের তিনি চিরতরে ত্যাগ করতেন। ১৯৮৪ সালে ইসলামপুরে মসজিদ নির্মাণ ইস্যুতে, ১৯৮৮ সালে লালবাগের কাটরা মসজিদ গণহত্যাকাণ্ডে এবং ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। সম্প্রীতির তত্ত্ব আওড়ানো বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তখন তাঁকে মঞ্চ আলো করার প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়। কারণ, তাঁর কাজ হঠাৎ করে, মরণকালে দেখনদারি নয়। জীবনাচারণের মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আমৃত্যু মিলনের সুর সৃষ্টি করাটাই ছিল ওই সুরসাধকের কাজ।

বাল্মিকী ও দোর্ণাচার্যের কাছে শিক্ষালাভের জন্য ক্ষত্রিয় হওয়া আবশ্যক ছিল। কর্ণ ও একলব্য তার প্রমাণ। ঘোষ, সাহা, ভট্টাচার্য ভাদুড়ি, সেন ও মুখোপাধ্যায়দের তাঁর আশ্রমতুল্য গৃহে আশ্রয় দিয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম দিতে দাউদের কাছ ধর্ম-সম্প্রদায়-গোত্র কোনও বাধা হয়নি কখনও।

তিনি সাম্প্রদায়িকতার অসুর নিধনের জন্য সুরকেই হাতিয়ার করেছিলেন। দাউদের এই সঙ্গীতজীবনকে আশ্রয় করে রচিত হয়েছে সাহিত্যিক আবুল বাশারের বিখ্যাত উপন্যাস ‘সুরের সাম্পান’। আজকের বিদ্বেষ বিষ আবাদের দিনে ঋষিতুল্য আবু দাউদের মতো মহতপ্রাণদের বড্ড বেশি প্রয়োজন। তাঁদের জীবনাচরণ অনুসরণ করলে ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকজনকে বাড়ি-ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া যাবে। বাড়ি করার জমি ও ফ্ল্যাট বিক্রি করার সময় জাতের নামে বজ্জাতির আশ্রয় নিতে হবে না। ‘হিন্দু, না ওরা মুসলিম?’ এমন উদ্ভট প্রশ্নেরও ক্রমে অবলুপ্তি ঘটবে।

বামেরা ক্ষমতা চ্যুত হতেই রামেদের ঘরে ঢুকে যাওয়া শতকরা ৩৮ শতাংশ ভোটবানের মতো ঘটনার ধাক্কাও তখন সামাল দেওয়া যাবে। নামাজ-রোজা, পুজো-তর্পণ করেও প্রকৃত ধর্মপ্রাণরা পরস্পরের বিষাদে ও হরষে কাঁধে কাঁধ, বুকে বুক মিলিয়ে থাকবে। যেমন কোভিডকালের সংকটময় সময়ে করোনা আক্রান্ত মৃতদেহ দাহ করতে ধর্মপ্রাণ তবলিঘিদের আচরণে মানবতা ছাড়া অন্য কোনও প্রশ্ন দেখা দেয়নি। শতবর্ষ আগে এমনটাই কামনা করেছিলেন ‘লোকহিত’- এর লেখক। আমাদের প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ। আবু দাউদ সেই ঘরণারই অনালোচিত এক বিরল আলোকবর্তিকা। শিক্ষার্থী বৎসল এক অনন্য শিক্ষক। সম্প্রীতির দীক্ষাগুরু। আজ শিক্ষক দিবসে তাঁকে স্মরণ করি।

News Source: Faruque Ahamed

Advertisements IBGNewsCovidService
USD