দুয়ারে সাংবাদিক – পুস্তক পরিচয় – আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে বাঙালি মুসলমান

0
122
দুয়ারে সাংবাদিক - পুস্তক পরিচয় - আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে বাঙালি মুসলমান
দুয়ারে সাংবাদিক - পুস্তক পরিচয় - আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে বাঙালি মুসলমান
ShyamSundarCoJwellers

দুয়ারে সাংবাদিক – পুস্তক পরিচয় – আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে বাঙালি মুসলমান

আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে বাঙালি মুসলমান

নাসিম-এ-আলম

এ পাড়ার বাঙালিরা থাকে, আর ও পাড়ায় মুসলমানরা। এমন মন্তব্যের সাথে কমবেশি পরিচিত আমরা সবাই। জাহিরুল হাসানের গ্রন্থ ‘বাঙালি মুসলমানের আটশো বছর’ গ্রন্থটির কথা এ প্রসঙ্গে মনে আসে, যৌথবঙ্গের মুসলমান পীর-ফকির আউলিয়ার প্রবেশ যদিও প্রায় হাজার বছর, কিন্তু বসতি স্থাপন ও সমাজ বিস্তার আটশো বছর। তাহলে আটশো বছর পাশাপাশি বসবাস করেও পারস্পরিক জানাশোনা ঠিক ততটা গভীর নয়।

সচেতন বাঙালি মুসলমান কিশোর স্কুলে পড়ার বয়স থেকে নানাবিধ আঘাতপ্রাপ্ত হতে থাকে। সে তার সমাজ ধর্মীয় উৎসব সংস্কৃতি নানা বিষয়ে, মনে অভিমানের মেঘ জমে ওঠে। এমন মেঘ যার থেকে অবিরাম বৃষ্টি ক্ষরণ হয় পরবর্তী সারাজীবন। স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকে বাঙালি মুসলমান বিষয়ে নিরন্তর চর্চা হয়েছে। পরপর দেশভাগ ও একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম বাঙালির পরিচয় ও সমস্যাকে অন্তহীন এবং বহুমুখী করে তোলে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কেবল বাঙালি মুসলমান সমাজ তেমনটা অবশ্যই নয়। বাঙালি হিন্দু সমাজও দেশভাগের দুর্ভাগ্যের শিকার। বিভাগ পরবর্তী সময়ে তাদের সবাই খুব ভালো আছেন এমন নয়। সবচেয়ে বড় কথা হল ফেলে আসা দেশের স্মৃতি। দেশ মানে তো শুধু মাটি নয়, নদী, দেশের বাড়ি, স্কুল-কলেজ, দৈনন্দিন জীবন, স্থানীয় সমাজ, প্রতিবেশী কি করে ভোলা যাবে সহজে।

বিভাগ পরবর্তী এপার বাংলার মুসলমান সমাজ যখন দিশেহারা, হাতের কাছে চাকরি বা ব্যবসার সুযোগ নেই, কৃষিনির্ভর জীবন, সেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া কম, সাংস্কৃতিক চর্চা প্রায় শূন্য অন্তত পাঁচের দশক পর্যন্ত।

তখন থেকেই অবশ্য নির্মিত হয়েছিল সংকল্প জেদ ভাবনা অর্থাৎ কিছু একটা করার বাসনা। রাজনীতির কথা বাদ দিলাম, আপাতত সাহিত্যের ক্ষেত্রে এম আব্দুর রহমান, গোলাম কুদ্দুস, আবদুল আজিজ আল আমান, আজাহার উদ্দিন খান হয়ে কবিরুল ইসলাম, শামশের আনোয়ার, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, আবুল বাশার, আফসার আমেদ সহ অনেক নাম। হাজার প্রতিকূলতার ভিড়ে আশার আলো নিশ্চয়ই। অন্তত জানান দেওয়া বেঁচেবর্তে আছি।

শিক্ষা প্রশ্ন করার সাহস যোগায়, যে প্রশ্ন একদা তুলেছিলেন আবুল ফজল। রবীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে তিনি জানতে চেয়েছিলেন যে আপনার কথাসাহিত্যে মুসলমান চরিত্র অনুপস্থিত কেন? সময় শুধু প্রশ্ন করে থেমে থাকে না সে সৃজনের হাত ধরে আগামীর পথ নির্মাণ করে। স্বাধীনতা উত্তর পর্বে অনেকগুলি অনুসন্ধানের মধ্যে কয়েকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মুসলমানদের অবদান। সুলতানি, মুঘল আমলের শিল্প ও সাহিত্য কর্ম নিয়ে নতুন দৃষ্টিপাত, মুসলমান সমাজের সামাজিক অতীত অবদানগুলি পুনরায় পাদপ্রদীপের আলোয় আনা। এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা করছেন বাঙালি সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু সমাজের উদারপন্থী অংশটি।

বিষয়ানুগ পড়াশোনার ভিড়ে হীরকখণ্ডের মতো একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ সংগ্রহ করলাম। বাঙালি ও মুসলমান লেখক মইনুল হাসান।

ছয়টি অধ্যায়ে বিস্তৃত গ্রন্থটির দিকে দৃষ্টি মেলে দেখি অধ্যায়গুলি এভাবে বিস্তৃত

  • (১) বাঙালি ও মুসলমান
  • (২) মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান : আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব
  • (৩) নামে-সম্বোধনে হিন্দু মুসলমান
  • (৪) সংকট কাল
  • (৫) আমার দেশ- আমার স্বপ্ন
  • (৬) স্বাধীনোত্তর বাংলার সংখ্যালঘু উন্নয়ন: একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।

সাংসদ হিসাবে মইনুল হাসান একবার দিল্লি যাচ্ছেন ট্রেনে যা শুনেছেন বোধহয় সেটাই এ গ্রন্থ রচনার মনোবীজ। যে অভিজ্ঞতা নানাভাবে আমাদেরও হয়ে থাকে নানা সময়ে। “অ্যাঁ! মুসলমান! আমি তো ভেবেছিলাম বাঙালি!” আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর আগের ঘটনা। জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার কিন্তু এ প্রশ্ন থেমে গেছে কী? নিশ্চিত না। আজ যে সদ্য তরুণ কলেজ পড়তে বাড়ি ছেড়ে কোথাও হোস্টেলে ঠাঁই নিয়েছে বা চাকরি পেয়ে কিছু দূরে আছেন বাড়ি ভাড়া করে, তাদের অনেকেই শুনছেন এমন কথা। একই অধ্যায়ে প্রাবন্ধিক মুসলমানদের বাঙালি না ভাবার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর শাণিত কলম নানা অভিমুখে পাঠকের মনে অনুরণন তোলে।

বাঙালি ও মুসলমান প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক মইনুল হাসান আলোচনা করেছেন দু’একটি অমোঘ বিষয়। তাঁর ভাষায়, ” মুসলমানদের বাঙালি না হয়ে ওঠার কারণ কি? প্রথম এবং সবচাইতে জোরালো কারণ মুসলমানদের সম্পর্কে না জানা। পাশাপাশিভাবে দুটো ধর্মের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী বাস করছে, কিন্তু কাউকে প্রায় জানেনা। বহুকাল ধরে এই বোধটা আমাদের অনেকের মধ্যে আছে। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে বা কেউ কেউ সংগঠিতভাবে জানার বোঝার চেষ্টা করেন এবং নানাবিধ চর্চা করেন। কিন্তু সমস্যাটা দূর হয়নি।

মুসলমান দেখতে কেমন? একথা বললে আমাদের মনে আবদুল মাঝির ছবি ভেসে ওঠে। মুসলমান মানেই মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি, পায়ের পাতার অনেক ওপরে পরা পাজামা, তাদের ভাষা উর্দু, মেয়েরা বোরখা পরে।” ভাগ্যের কী নিদারুণ পরিহাস। ভাবনার পরিসর ও অজ্ঞতা কত ছোট অনেকের তথা একটি সংখ্যাগুরু সমাজের বিশাল অংশের। ভাবলে বিস্ময়ের সীমানা থাকে না যে বাংলা ভাষার জন্য মুসলমানরা প্রাণ দিয়েছে, জন্ম হয়েছে ভাষার জন্য বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশের, সেই মুসলমান সমাজের ভাষা নাকি উর্দু! কি করবেন অভিমান না রাগ!

লেখক অবশ্য ভারতবর্ষের অন্য রাজ্যের দিকেও দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। শুধু বাঙালি সংখ্যালঘু (এপার বাংলা) কেন, অত্যাচারের তালিকা থেকে বাদ যান না দলিত, হরিজন তথা নিম্নবর্গের ভারতীয় সংখ্যাগুরু সমাজের মানুষ। উদাহরণ হিসাবে বিহারের বেলাচির কথা উল্লেখ করেছেন লেখক। সেখানে এগারোজন আদিবাসীকে পুড়িয়ে মারা হয়। পরপর জােহানাবাদ সহ বেশ কয়েকটি ঘটনার নির্মমতা বিষণ্ণ করে আমাদের।

তবে মইনুল হাসান সাহসিকতার সঙ্গে যে দিকটির কথা উল্লেখ করেছেন তাহলো বামপন্থী সাম্প্রদায়িকতা তথা মুসলমান সমাজের প্রতি তাদের উপেক্ষা। চৌত্রিশ বছরে ক’জন দামি দপ্তর পেয়েছেন বা পার্টির উচ্চপদে আসীন হয়েছেন এপারের বাঙালি সংখ্যালঘু সমাজ? আজ যখন বিধানসভায় বামপন্থীরা আসনের দিক থেকে শূন্য তখন প্রাবন্ধিকের তোলা প্রশ্নগুলি বর্তমান বামপন্থীদের ভাবতে হবে। নতুবা আগামীর সম্ভাবনাও শূন্য থেকেই যাবে।

আশার কথা এই যে, ভারতের অন্যান্য প্রদেশের থেকে বাঙালি তুলনামূলকভাবে উদার, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক পাশাপাশি বসবাসের একটি ইতিহাস এখানে রয়েছে। প্রকৃত অর্থেই অনেক উদারপন্থী মানুষ কাজ করছেন ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য, নতুবা পদে পদে অসুবিধা হতো জীবনযাপনে। অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের একটি বক্তৃতা উল্লেখ করে বিষয়টি হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন লেখক।

বিষয়টি সিদ্ধাচার্য ভুসুক’র চর্যাপদ থেকে পাওয়া। পদটি এখানে উল্লেখ করছি–
“পেড়ে এনে ব্রজনাথও পদ্মখালে বাওয়া
লুট করে নিল দেশ অদ্বয় বঙ্গাল
আজকে ভুসুক হল (জাতিতে) বঙ্গালী
চণ্ডালীকে (ভুসুকুর) পত্মীরূপে নেওয়া।”

১২০ পাতার গ্রন্থে এমন অজস্র মণিমুক্তো মইনুল হাসান তাঁর মননশীল কলমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত দেশকে ভালবাসতে হবে, বুকের গভীরে গ্রহণ করতে হবে। আমরা একমত লেখকের সঙ্গে। তাঁর মন্তব্য, “নিজেকে গড়ার, দেশ গড়ার শপথ নিতে হবে, তারুণ্যের বন্যায় অনেক জমানো কাদা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমরা সবাই মিলে নতুন দিনকে আহ্বান করার জন্য অপেক্ষা করব।”

গ্রন্থের প্রকাশক ‘উদার আকাশ’ তার কর্ণধার তরুণ লেখক ফারুক আহমেদ। ফারুককে আমাদের হৃদয়ের উষ্ণতা, এমন একটি প্রয়োজনীয় গ্রন্থ উপহার দেবার জন্য।

বাঙালি ও মুসলমান
মইনুল হাসান
প্রকাশক: উদার আকাশ
ঘটকপুকুর, বি গোবিন্দপুর,
ভাঙড়, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা-৭৪৩৫০২,
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
কথা: ৭০০৩৮২১২৯৮

দুয়ারে সাংবাদিক কর্মীরা আপনাদের সকল শুভ কাজে পাশে থেকে আপনাদের কথা তুলে ধরবে । যোগরোগ এর জন্য মেইল করুন

Advertisements IBGNewsCovidService
USD